ফ্রিল্যান্সিংয়ের সূর্য কি অস্তমিত হবে ?
ফ্রিল্যান্সিংয়ের সূর্য কি অস্তমিত হবে ?
টাওয়ারে ভর করে স্মার্ট হওয়া যায় না, দক্ষতায় ভর করে স্মার্ট হতে হয়।
ফ্রিল্যান্সার সাধারণত এমন একজন ব্যক্তি, যিনি
নির্দিষ্ট কোনো নিয়োগকর্তার কাছে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়ে স্বাধীনভাবে
নিজেই কাজ করেন। সেই কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান।
২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ২৪
শতাংশ ফ্রিল্যান্সার ভারতের এবং ১৬ শতাংশ বাংলাদেশের। ভারতের অবস্থান প্রথম,
বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বরাবরের মতোই সংখ্যা নিয়ে উচ্ছ্বসিত
আমরা ‘দ্বিতীয় দ্বিতীয়’ বলে
শোরগোল তুলতে থাকলাম। গুণগত মান নিয়ে কথা বলার জন্য কোথাও কেউ ছিল না। এখনো কেউ
নেই।
আমাদের জেলায় জেলায় টাওয়ার হয়েছে,
ফাইবার অপটিক সংযোগ হয়েছে, নেটওয়ার্ক
হয়েছে; কিন্তু ৬৪ জেলা থেকে ৬৪ জন করে প্রথম সারির সাইবার
নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ, উপাত্তবিজ্ঞানী, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী কিংবা ৬৪ জন ডেটা সেন্টার–বিশেষজ্ঞ কি তৈরি হয়েছে?
সম্প্রতি সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন ফ্রিল্যান্সার নিয়োগের জন্য
শীর্ষ ৩০টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকার প্রথম স্থানে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের
অবস্থান ওপরের দিক থেকে দ্বিতীয় আর বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়, অর্থাৎ
২৯তম। বাংলাদেশের স্কোর ১০০–এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৯২,
যেখানে ভারতের স্কোর ৯৫ দশমিক ৭১। প্রথম স্থানে থাকা
যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর ৯৭ দশমিক ৪৬।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দক্ষতা, সে দক্ষতায়
অর্থাৎ ‘মানবসম্পদ’ তৈরিতে আমরা
পিছিয়ে পড়ছি উদ্বেগজনক হারে। সিসকো ডিজিটাল প্রস্তুতি সূচক ২০২১ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। সেই সূচকের
মানবপুঁজি ও স্টার্টআপ পরিবেশ শ্রেণিতে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১১৮ ও ১৪৪তম।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের
জগতে এখন আর কিছু একটা শিখে বসে থাকার সুযোগ নেই। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল দক্ষতার
বাজারে নিত্যনতুন দক্ষতা,
প্রশিক্ষণ নিতে না পারলে সে অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তন
করতে না পারলে, ক্রমাগত আমরা পেছাতেই থাকব
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি না থাকলে উচ্চশিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে এসে বা কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ করে সেগুলোয় নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন।
প্রাইমারি ক্লাসে কোডিং যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বা
সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা কি করা হয়েছে? প্রাথমিকের
শিক্ষকদের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে এশিয়ায় শেষের দিকের অবস্থানে আছে বাংলাদেশ (বণিক
বার্তা, মে ২৬, ২০২৪)। ফলাফলও
পাওয়া যাচ্ছে হাতেনাতেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা জরিপ
বলছে, তৃতীয় শ্রেণির ৭৬ শতাংশ ও চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী
বাংলাই ঠিকমতো পড়তে পারে না। তৃতীয় শ্রেণিতে ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী সংখ্যা চিনতে
পারে না (প্রথম আলো, ২৫ মার্চ, ২০২৪)।
জ্ঞানভিত্তিক বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় শুধু দৈহিক শ্রম দিয়ে বেশি
দূর যাওয়া যাবে না। যে সস্তা শ্রম থেকে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, অটোমেশনের
প্রভাবে সেটিও হুমকির মুখে।
এটুআইয়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে গার্মেন্টস খাতের ৬০ শতাংশ
চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রযুক্তি সৃষ্টির দক্ষতা দূরে থাক, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনেও আমাদের অবস্থা সুখকর নয়। জিএসএমএর ‘দ্য মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী,
বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ নারী ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে জানেন,
কিন্তু তারপরও তাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। ব্যবহার না করার
প্রথম কারণ আর্থিক সামর্থ্যের অভাব নয়, বরং ডিজিটাল
সাক্ষরতা ও দক্ষতার অভাব।
সফটওয়্যার খাতের সংগঠন বেসিসের
সদস্যসংখ্যা ২ হাজার ৫০০–এর বেশি। এর মধ্যে
২৫টি মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানও কি পাওয়া যাবে, যারা সাইবার
নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অথবা উপাত্ত বিশ্লেষণ
নিয়ে বিশেষ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে? প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই
যদি আমরা পিছিয়ে পড়ি, ব্যক্তিপর্যায়ের ফ্রিল্যান্সিংয়ে
এগোনোর পথ তো আরও কঠিন।
Comments
Post a Comment